হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া গালফে কাজ করা যেকোনো বাংলাদেশির জন্য বড় ধাক্কা। কিন্তু এই সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে আতঙ্ক আর ভুল পরামর্শ। ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট বাতিলের পর আপনি আইনগতভাবে আর কত দিন থাকতে পারবেন, সেই দিনগুলোতে কী করা যাবে আর কী করা যাবে না — এটুকু জানা থাকলে জরিমানা, হুরুব বা প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। নিচে ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।
প্রথম ৪৮ ঘণ্টা: মুখের কথা নয়, কাগজ জোগাড় করুন
সুপারভাইজার বা পিআরও মুখে যা-ই বলুক, পরে সেই কথার কোনো দাম নেই। প্রমাণ থাকে কাগজে। থাকার জায়গা ছাড়ার আগে বা কোনো কার্ড হাতে তুলে দেওয়ার আগে যতটা সম্ভব সংগ্রহ করে নিন:
- তারিখসহ লিখিত চাকরিচ্যুতির চিঠি বা পদত্যাগপত্র
- আপনার সই করা চুক্তির কপি এবং শেষ তিন থেকে ছয় মাসের বেতন স্লিপ বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট
- সার্ভিস বেনিফিট, বকেয়া বেতন, না-নেওয়া ছুটি ও টিকিটের পাওনা — সবকিছুর লিখিত হিসাব
- আকামা বা রেসিডেন্স কার্ডের দুই পিঠের ছবি এবং পাসপোর্টের প্রথম পাতার ছবি
- আপনার ওয়ার্ক পারমিট নম্বর ও কোম্পানির এস্টাবলিশমেন্ট নম্বর, যাতে নিজের অবস্থা নিজেই অনলাইনে দেখতে পারেন
এরপর পিআরওর কথায় ভরসা না করে সরকারি অ্যাপে নিজে গিয়ে স্ট্যাটাস দেখুন। তিনটি জিনিস মেলান — আকামা বা রেসিডেন্স এখনো বৈধ আছে কি না, ওয়ার্ক পারমিট বাতিল হয়েছে কি না, এবং আপনার নামে হুরুব বা অ্যাবসকন্ডিং মামলা বসানো হয়েছে কি না।
কোম্পানি যদি পাসপোর্ট ফেরত দিতে না চায়, সেটাকে স্বাভাবিক ভাববেন না — গালফের প্রায় সব দেশেই মালিকের কাছে কর্মীর পাসপোর্ট আটকে রাখা বেআইনি। কীভাবে ফেরত পাবেন তা নিয়ে আলাদা করে লেখা আছে নিয়োগকর্তা আপনার পাসপোর্ট আটকে রেখেছে: এটি বেআইনি, ফেরত পাওয়ার উপায় লেখাটিতে।
“গ্রেস পিরিয়ড” আসলে জিনিসটা কী
গ্রেস পিরিয়ড হলো রেসিডেন্স পারমিট বাতিল বা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর যে কয়টা দিন আপনি বৈধভাবে দেশটিতে থাকতে পারেন — নতুন কফিলের কাছে ট্রান্সফার করতে, ভিসার ধরন বদলাতে, কিংবা দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে। এখানে দুটি ভুল বোঝাবুঝি থেকেই বেশির ভাগ বিপদ হয়:
- ঘড়ি সাধারণত চালু হয় ইমিগ্রেশন যেদিন বাতিলের কাজটি প্রসেস করে, আপনার শেষ কর্মদিবস থেকে নয়। দুটোর মাঝে কয়েক সপ্তাহের ফারাক হতে পারে।
- বেশির ভাগ দেশে এই সময়ে কাজ করা যায় না। এটি কাগজপত্র ঠিক করার সময়, অস্থায়ী কাজের অনুমতি নয়।
দেশ অনুযায়ী কী দেখবেন
সৌদি আরব
প্রতিবেশী কিছু দেশের মতো সৌদি আরব নির্দিষ্ট একটি “গ্রেস পিরিয়ড” সংখ্যা প্রকাশ করে না। আপনার বৈধ অবস্থান চলে আকামার মেয়াদ অনুযায়ী, তাই আবশের বা মুকিমে গিয়ে আগে মেয়াদ শেষের তারিখটা দেখে নিন। এরপর কফিলকে হয় আকামা নবায়ন করতে হবে, নয়তো কিওয়ার মাধ্যমে ট্রান্সফারের জন্য ছেড়ে দিতে হবে, নয়তো ফাইনাল এক্সিট ইস্যু করতে হবে। শ্রম সংস্কারের নিয়মে নতুন নিয়োগকর্তা কিওয়াতে ট্রান্সফারের অনুরোধ তুলতে পারেন, এবং নির্দিষ্ট কিছু অবস্থায় বর্তমান নিয়োগকর্তার অনুমোদন ছাড়াই সেটি হয় — শর্তগুলো qiwa.sa-র ট্রান্সফার পাতায় দেওয়া আছে। ফাইনাল এক্সিটের নিজস্ব সময়সীমা আছে: জাওয়াজাতের ঘোষণা অনুযায়ী ফাইনাল এক্সিট নিতে হলে আকামার মেয়াদ অন্তত ৩০ দিন বাকি থাকতে হবে; আকামায় ৬০ দিন বা তার বেশি থাকলে ভিসাটি ৬০ দিনের জন্য ইস্যু হয়, আর ৩০ থেকে ৬০ দিন বাকি থাকলে যত দিন অবশিষ্ট ততদিনের জন্য। সময়মতো দেশ না ছাড়লে জরিমানা হয় — অঙ্কটি নিজের কেসের জন্য আবশের বা জাওয়াজাত থেকে যাচাই করে নেবেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত
নিয়োগকর্তা প্রথমে MOHRE-তে ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে, তারপর ICP বা GDRFA-তে রেসিডেন্স ভিসা বাতিল করে। গ্রেস পিরিয়ড গোনা শুরু হয় ইমিগ্রেশনের ওই বাতিলের তারিখ থেকে। ভিসার ধরন অনুযায়ী দিনের সংখ্যা আলাদা — সাধারণ কর্মসংস্থান ভিসায় যা পাওয়া যায় তা গোল্ডেন বা গ্রিন ভিসাধারীদের তুলনায় অনেক কম। তাই কারও মুখে শোনা “ছয় মাস আছে” ধরে নিয়ে বসে থাকবেন না। ICP-র স্মার্ট সার্ভিসে গিয়ে File Validity দেখুন এবং আপনার নিজের ফাইলে “allowed days to stay” কত লেখা আছে সেটা পড়ুন। মেয়াদ পার হলেই দৈনিক হারে জরিমানা যোগ হতে থাকে।
কাতার
২০২০ সালের সংস্কারের পর শ্রম আইনের আওতাভুক্ত কর্মীদের চাকরি বদলাতে আর এনওসি লাগে না; আবেদন করতে হয় শ্রম মন্ত্রণালয়ের অনলাইন ব্যবস্থায়। তবে নোটিশ পিরিয়ড এখনো মানতে হয় — সাধারণত দুই বছর পর্যন্ত চাকরির জন্য এক মাস, তার বেশি হলে দুই মাস। নোটিশ না দিয়ে চলে গেলে পরে কাতারে কাজ পাওয়ার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বেসরকারি খাত, গৃহকর্মী, সরকারি খাত এবং তেল-গ্যাস খাতের প্রায় সব কর্মীর জন্য এক্সিট পারমিট তুলে দেওয়া হয়েছে; তবে সামরিক কর্মী এবং নির্দিষ্ট পদে কোম্পানির সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কর্মীর ক্ষেত্রে এখনো আগাম অনুমোদন লাগতে পারে। QID-র অবস্থা দেখুন MOI পোর্টাল বা Metrash2 অ্যাপে।
ওমান
নিয়োগকর্তা বদলানোর জন্য আগের এনওসি শর্ত তুলে দেওয়া হয়েছে; নোটিশ পিরিয়ড চলে শ্রম আইন ও আপনার চুক্তি অনুযায়ী। শ্রম মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের পর বাতিল ও দেশ ছাড়ার আনুষ্ঠানিকতা দেখে রয়্যাল ওমান পুলিশ (ROP)। পারমিটের মেয়াদ ফুরানোর আগেই ROP থেকে দেশ ছাড়ার সময়সীমা এবং বর্তমান ওভারস্টে জরিমানার হার জেনে নিন — দালাল বা পরিচিতজনের মুখে শোনা অঙ্ক প্রায়ই বহু বছরের পুরনো।
বাহরাইন
প্রবাসী কর্মীদের জন্য LMRA-র নির্দেশনায় বলা আছে, ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হলে বা বাতিল হলে নতুন নিয়োগকর্তা খোঁজার জন্য ৩০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড পাওয়া যায়, এবং জাতীয়তা, পাসপোর্ট ও বসবাস কর্তৃপক্ষের (NPRA) মাধ্যমে সেটি আরও ৩০ দিন বাড়ানো যেতে পারে। এই সময়ের মধ্যে কোনো কাজে যোগ দেওয়া যাবে না। নতুন কফিল না পেলে দেশে ফিরে যেতে হবে; বৈধ পারমিট ছাড়া থেকে গেলে ওভারস্টে জরিমানা ও ডিপোর্টেশনের ঝুঁকি তৈরি হয়।
কুয়েত
ট্রান্সফারের নিয়ম নির্ভর করে আপনার ভিসার ধারা (আর্টিকেল), বর্তমান কফিলের অধীনে কত দিন কাজ করেছেন এবং কফিল ছাড়পত্র দিচ্ছেন কি না — এই বিষয়গুলোর ওপর। বাতিলের পর কত দিন থাকা যায় এবং দৈনিক জরিমানা কত, এ নিয়ে অনলাইনে ঘুরতে থাকা তথ্য একেক জায়গায় একেক রকম, তাই ওসব সংখ্যার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করবেন না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রেসিডেন্সি সেবায় নিজের মেয়াদ দেখুন এবং ট্রান্সফারের যোগ্যতা manpower.gov.kw-তে নিশ্চিত করে নিন।
গ্রেস পিরিয়ড ফুরিয়ে গেলে কী হয়
গালফের সব দেশেই ওভারস্টের জরিমানা দিন হিসাবে বাড়ে, এবং সাধারণত পুরো টাকা শোধ না করলে আপনি দেশ ছাড়তে পারবেন না বা নতুন পারমিট পাবেন না। টাকার বাইরেও ক্ষতি আছে — মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থা স্পনসরশিপ ট্রান্সফার আটকে দিতে পারে, পুনঃপ্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আনতে পারে, কিছু ক্ষেত্রে আটক ও ডিপোর্টেশন পর্যন্ত গড়ায়। সঙ্গে যদি হুরুব বা অ্যাবসকন্ডিং মামলাও থাকে, তাহলে দুটোই আলাদা করে মেটাতে হবে। নিরাপদ নিয়মটা সহজ: হাতে সময় থাকতেও যদি লিখিত চাকরির অফার না থাকে, শেষ সপ্তাহের অপেক্ষা না করে তখনই দেশে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু করে দিন।
ট্রান্সফার না এক্সিট — সিদ্ধান্ত আগেভাগে নিন
স্পনসরশিপ ট্রান্সফার করতে পারলে আয় বন্ধ হয় না এবং আবার নতুন করে আসার খরচ বাঁচে। কিন্তু এর জন্য দরকার সত্যিকারের একটি অফার, কোটা আছে এমন একজন নিয়োগকর্তা, আর হাতে যথেষ্ট দিন। এই তিনটির কোনোটি না মিললে ট্রান্সফারের আশায় ঝুলে না থেকে গুছিয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ইনস্যুরেন্স, বকেয়া পাওনা এবং ব্যাংক
কোম্পানির দেওয়া স্বাস্থ্যবিমা সাধারণত পারমিট বাতিলের সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়, আর গালফের বেশ কয়েকটি দেশে বিমা থাকা বসবাসের আইনি শর্ত। তাই ঠিক কোন তারিখে কাভারেজ বন্ধ হচ্ছে, সেটা লিখিতভাবে জেনে নিন।
সার্ভিস বেনিফিটের হিসাব ঠিক আছে কি না নিজে মিলিয়ে দেখুন — কোম্পানি আসলে কত টাকা দিতে বাধ্য, তা ব্যাখ্যা করা আছে গালফে এন্ড অব সার্ভিস গ্র্যাচুইটি: নিয়োগকর্তা আসলে আপনাকে কত টাকা দিতে বাধ্য লেখাটিতে। বেতন বা সার্ভিস বেনিফিট বকেয়া থাকলে দেশ ছাড়ার আগেই, বৈধ অবস্থায় থাকতে থাকতেই শ্রম কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দায়ের করুন — দেশে ফিরে ফোন করার চেয়ে নথিভুক্ত একটি মামলা অনেক বেশি কাজে দেয়। ধাপগুলো দেওয়া আছে গালফে বকেয়া বেতন: শ্রম অভিযোগ দায়েরের ধাপে ধাপে নির্দেশিকা লেখাটিতে।
ব্যাংককেও আগেভাগে জানিয়ে রাখুন। ভিসা বাতিল হলে অনেক সময় অ্যাকাউন্ট জমে যায় (ফ্রিজ হয়), আর আপনার শেষ পাওনার টাকাটাই ভেতরে আটকে যায়।
পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নিজে যাচাই করুন
গ্রেস পিরিয়ড, জরিমানা ও ট্রান্সফারের শর্ত নিয়মিত বদলায়, আর দালালরা প্রায়ই কয়েক বছর আগে বাতিল হয়ে যাওয়া নিয়ম শোনায়। নিজের কেসটা সরকারি পোর্টালেই দেখুন — সৌদি আরবের জন্য absher.sa, muqeem.sa ও qiwa.sa; আমিরাতের জন্য icp.gov.ae, gdrfad.gov.ae ও mohre.gov.ae; কাতারের জন্য moi.gov.qa ও adlsa.gov.qa; ওমানের জন্য rop.gov.om; বাহরাইনের জন্য lmra.gov.bh; কুয়েতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রেসিডেন্সি সেবা ও manpower.gov.kw। নিয়োগকর্তা সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর বা লেবার উইং বিনামূল্যে সাহায্য করতে পারে।
এটি কমিউনিটির জন্য সাধারণ তথ্য, আইনি পরামর্শ নয়। কাগজগুলো যত্ন করে রাখুন, তারিখগুলো লিখে রাখুন, আর ঘড়ির কাঁটা ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই নিজের সংখ্যাগুলো সরকারিভাবে মিলিয়ে নিন।
From Gulf Desi Hub
Hiring workers from India, Pakistan, Bangladesh, Nepal or Sri Lanka?
Post your vacancy here for free. We check the company before a listing goes live, and no worker is ever asked to pay to apply.
Post a Job — Free
Leave a Reply